সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
সাদা দাড়ি, লাল জামা, মাথায় টুপি, আর হাসিমুখে উপহারের ঝুলি—এই চেহারাতেই গোটা বিশ্ব চেনে সান্তা ক্লজকে। আট থেকে আশি, বড়দিন এলেই সান্তার নাম শুনলে চোখে ভেসে ওঠে এক রূপকথার চরিত্র। বিশ্বাস করা হয়, বড়দিনের আগের রাতে স্লেজ গাড়িতে চেপে সান্তা নেমে আসেন পৃথিবীতে। চুপিচুপি বাড়িতে ঢুকে শিশুদের জন্য উপহার রেখে যান। ছোটদের কৌতূহল আর বিশ্বাসে ভর করে আজও সান্তা বড়দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই—সান্তা ক্লজ কি শুধুই কল্পনার সৃষ্টি? নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনও বাস্তব ইতিহাস? উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় ১৭০০ বছর আগের এক মানবিক গল্পে।
🎁 সান্তার পেছনের মানুষ: সেন্ট নিকোলাস
রূপকথার সান্তা ক্লজের শিকড় লুকিয়ে আছে সেন্ট নিকোলাস নামে এক খ্রিস্টান বিশপের জীবনে। চতুর্থ শতকে বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত প্রাচীন শহর মায়রা-য় বসবাস করতেন তিনি। সেন্ট নিকোলাস ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, উদার ও মানবপ্রেমী। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল অসীম।
লোককথা অনুযায়ী, সেন্ট নিকোলাস গোপনে দরিদ্র পরিবার ও শিশুদের বাড়িতে উপহার রেখে আসতেন। কোনও নাম বা পরিচয় না রেখেই সাহায্য করতেন, যাতে উপকার পাওয়া মানুষ লজ্জায় না পড়েন। এই নিঃস্বার্থ দান ও গোপন উপহার দেওয়ার রীতিই পরবর্তী কালে সান্তা ক্লজের কাহিনির ভিত্তি তৈরি করে।

সেন্ট নিকোলাসের মৃত্যুদিন, অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর, তাঁর অনুগামীরা ‘সেন্ট নিকোলাস ডে’ হিসেবে পালন করতেন। সেই দিন শিশুদের উপহার দেওয়ার রীতিও চালু ছিল।
—
🌍 ইউরোপ থেকে আমেরিকা: সান্তার নাম বদলের গল্প
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেন্ট নিকোলাসের কাহিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ডাচ সংস্কৃতিতে তিনি পরিচিত হন ‘সিন্টেরক্লাস’ নামে। সপ্তদশ শতকে ডাচরা যখন আমেরিকায় পাড়ি দেন এবং নিউ আমস্টারডাম (বর্তমান নিউ ইয়র্ক) শহর গড়ে তোলেন, তখন সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এই সিন্টেরক্লাসের গল্প।
সিন্টেরক্লাসও শিশুদের সঙ্গে দেখা করতেন, মিষ্টি ও উপহার দিতেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের লোককথা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রভাব মিশে তৈরি হতে থাকে এক নতুন চরিত্র—যিনি আর শুধু ধর্মীয় নন, হয়ে উঠলেন সার্বজনীন আনন্দের প্রতীক।
ডাচ ‘সিন্টেরক্লাস’ নামটিই সময়ের সঙ্গে বদলে যায় ‘সান্তা ক্লজ’-এ।
—
🎨 লাল জামার জন্ম কী ভাবে?
আজ আমরা যে সান্তা ক্লজকে চিনি—লাল স্যুট, কালো বেল্ট, হাসিখুশি, স্থূলদেহী এক বুড়ো—এই চেহারাটা কিন্তু শুরু থেকেই এমন ছিল না। এই রূপটি গড়ে উঠেছে উনিশ ও বিশ শতকে শিল্পী ও লেখকদের কল্পনায়।
১৮২৩ সালে প্রকাশিত একটি বিখ্যাত কবিতা, A Visit from St. Nicholas (যা ‘Twas the Night Before Christmas’ নামেও পরিচিত), সান্তার চেহারা নিয়ে প্রথম বিস্তারিত বর্ণনা দেয়। সেখানে তাঁকে দেখা যায় হাসিখুশি, গোলগাল, দয়ালু এক বৃদ্ধ হিসেবে—যিনি রাতের অন্ধকারে স্লেজে চেপে উপহার নিয়ে আসেন।
এর পর ১৮৬০-এর দশকে কার্টুনিস্ট থমাস নাস্ট একটি ম্যাগাজিনে সান্তার ছবি আঁকেন। তাঁর আঁকা সান্তার লাল জামা, সাদা দাড়ি, প্রশস্ত হাসি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই ছবিই পরবর্তী শতকে বিজ্ঞাপন, গল্প ও সিনেমার মাধ্যমে আরও জনপ্রিয় হয়ে যায়।
পরবর্তীকালে এই রূপটিই বিশ্বজুড়ে সান্তা ক্লজের চূড়ান্ত চেহারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়
❤️ কল্পনা নয়, মানবিকতার প্রতীক
সান্তা ক্লজ শুধুই কোনও রূপকথার চরিত্র নন। তিনি আসলে ভাগ করে নেওয়া, দয়া ও নিঃস্বার্থ ভালবাসার প্রতীক। সেন্ট নিকোলাসের মানবিক আদর্শ থেকেই জন্ম এই চরিত্রের, যা সময়ের সঙ্গে বদলে আজ বিশ্বজুড়ে বড়দিনের আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
আজও যখন শিশুরা বিশ্বাস করে সান্তা তাদের জন্য উপহার রেখে যাবে, তখন সেই বিশ্বাসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানবিকতার সবচেয়ে সুন্দর গল্প।