সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
ভারতবিরোধী কট্টরপন্থী নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকেই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যু হতেই মধ্যরাত থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ঢাকা, রাজশাহী-সহ একাধিক শহরে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর সামনে আসার পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের সমর্থক এবং হাসিনা-বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী রাজপথে নেমে পড়ে। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের অফিসে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ ও রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে উত্তেজিত জনতা। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’-র অফিসেও হামলা চালানো হয় এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
এই বিক্ষোভের মধ্যে প্রকাশ্যে শোনা যায় তীব্র ভারতবিরোধী স্লোগান—‘দিল্লি না ঢাকা’, ‘ভারতের আগ্রাসন ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’। শুধু তাই নয়, উন্মত্ত জনতার একটি অংশ ভারতের হাইকমিশনের দিকেও এগোনোর চেষ্টা করে বলে সূত্রের দাবি। একইসঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও শোনা যায়, যা গোটা পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক স্তরেও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকার জাতীয় শোক ঘোষণা করে। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন দেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। তিনি দেশবাসীকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “হাদি ছিলেন সন্ত্রাসবাদের শত্রু। তাঁকে হত্যা করে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।” তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এই সময় কেউ যেন ষড়যন্ত্রকারীদের ফাঁদে পা না দেন।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন এলাকার কালভার্ট রোডে টোটোয় চড়ে যাওয়ার সময় খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয় ওসমান হাদির মাথায়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের নিউরোসার্জিক্যাল আইসিইউ-তে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুরের বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসকদের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর প্রাণ রক্ষা করা যায়নি।
হাদির মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা রাজনৈতিক অভিযোগ ও পাল্টা দাবি। হাদির বোন মাহফুজা এই হামলার জন্য ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর দিকে আঙুল তুলেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে দাবি করা হচ্ছে, অভিযুক্ত ফয়সাল করিম একজন প্রাক্তন আওয়ামী লীগ নেতা। আরও এক অভিযুক্ত কায়সার ভারতে পালিয়ে গিয়েছেন বলে দাবি করা হলেও, অন্য একটি সূত্র বলছে তিনি বর্তমানে দুবাইতে রয়েছেন। এই সব পরস্পরবিরোধী দাবিতে পরিস্থিতি আরও ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হাদি ছিলেন প্রকাশ্য ও কট্টর ভারতবিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত। হাসিনার বিদায়ের পর একাধিক জনসভায় তিনি ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগানকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি ফেসবুকে ভারতের একটি বিকৃত মানচিত্র পোস্ট করেন, যেখানে পঞ্জাব, লাদাখ ও জম্মু-কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং মায়ানমারের আরাকান প্রদেশের কিছু এলাকাকে তথাকথিত ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’-এর অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই পোস্ট ঘিরেও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
এর আগেও ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হামলার ঘটনায় হাদির নাম জড়িয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে উস্কানিমূলক মন্তব্য ও চরমপন্থী বক্তব্যের জন্য তিনি বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন। তবুও, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক পরিচিত মুখ। তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর উত্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের ছাত্র রাজনীতির পরিসরেই।

হাদির মৃত্যুর পর ঢাকার রাস্তায় উঠেছে নতুন স্লোগান—“আমিও হাদি হব, গুলির মুখে কথা কবো।” এই স্লোগানেই স্পষ্ট, তাঁর মৃত্যু বহু তরুণের মধ্যে আবেগ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের মনোভাব উসকে দিয়েছে। হাদি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি সমর্থকদের কাছে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, আবার সমালোচকদের চোখে ছিলেন বিপজ্জনক উগ্রপন্থার মুখ।
সব মিলিয়ে, Hadi death Bangladesh situation শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং তা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর গোটা উপমহাদেশের।