সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএম এখনো বৃদ্ধতন্ত্র কায়েম রাখলেও প্রথম থেকেই নির্বাচনী রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মকে উত্তরাধিকার হস্তান্তর করার পক্ষপাতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কারণেই ২০১৪ সালে তরতাজা যুবক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন ডায়মন্ড হারবারের মতো কঠিন লোকসভা কেন্দ্রে লড়াই করেছিলেন, থেকে যেমন ভাবে প্রবল বিজেপি ঝড়ের মধ্যেও মতুয়া ঠাকুরবাড়ির প্রতিনিধি মমতাবালা ঠাকুরের সদ্য কলেজ উত্তীর্ণ মেয়ে মধুপর্না ঠাকুরকে বিধানসভা উপনির্বাচনে টিকিট দিয়েছিলেন তেমন রাজনৈতিক ঝুঁকি মমতা ছাড়া আর কেউ আজ পর্যন্ত নেয়নি।
তবে একইসঙ্গে তৃণমূলে মমতার রাজনৈতিক জীবনের একেবারে শুরু থেকে রয়ে গিয়েছেন প্রবীণ বিধায়ক অশোক দেব, শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র অথবা লোকসভার ক্ষেত্রে সৌগত রায় এবং সুদীপ বন্দোপাধ্যায়রা। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি বয়সের কথা মাথায় রেখে এবারে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের হাতে রাজনৈতিক ব্যাটন ট্রান্সফার করার কথা ভাবছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
এমনিতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক বছরে তৃণমূলের মধ্যে তরুণ প্রজন্মকে বেশি করে শামিল করার জন্য লড়াই করে আসছেন। কিন্তু মমতা নিজের পুরনো সঙ্গীদের কখনো মাঝপথে ছেড়ে আসেন না। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এবারে বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম থেকে নিজের রাজনৈতিক লড়াইয়ে পাশে থাকা সহকর্মীদের ছেলে এবং মেয়েরা যারা প্রত্যক্ষভাবে দিনরাত তৃণমূলের ডিজিটাল যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে টিকিট দিতে চলেছেন মমতা। অন্তত কালীঘাট সূত্রে তেমনটাই জানা গিয়েছে।
কারা কোথায় এগিয়ে
বেশ কয়েক বছর ধরেই বাবার নির্বাচনী লড়াইয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে সায়ন দেব চট্টোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে নিজের জেতা ভবানীপুর আসন ছেড়ে একেবারে অচেনা উত্তর চব্বিশ পরগনার ময়দানে ভোটের লড়াইয়ে যখন শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়কে নামতে হয়েছিল তখন তার নির্বাচনী কাজকর্ম অনেকখানি দেখেছেন সায়ন দেব। এবারে তাকে টিকিট দিতে পারে তৃণমূল।
উত্তর কলকাতায় টানা ন’বার অর্থাৎ টানা তিন তিনটে হ্যাট্রিক করে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে জনপ্রতিনিধি হওয়ার নয়া রেকর্ড করেছিলেন প্রয়াত সাধন পান্ডে। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পরে সাধন পান্ডে শারীরিক অসুস্থতার জন্য মারা যাওয়ার পরে মমতা বিধানসভা উপনির্বাচনে প্রার্থী করেছিলেন সাধনের স্ত্রী সুপ্তি পান্ডেকে। তিনি সরাসরি রাজনীতিতে খুব সক্রিয় না থাকলেও বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে এবং তৃণমূলের হয়ে মাঠে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গিয়েছে সাধন কন্যা শ্রেয়াকে। ত্রিপুরার নির্বাচন হোক অথবা লন্ডনের অক্সফোর্ড বক্তৃতায় মমতার বিরুদ্ধে যখন সিপিএম এবং বিজেপি কুৎসার রাজনীতি করে চলেছে সেখানেও নিজের খরচে পৌঁছে গিয়ে মমতার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছিলেন শ্রেয়া পান্ডে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে মানিকতলা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হতে পারেন শ্রেয়া পান্ডে।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় নাম উঠতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের মেয়ে প্রিয়দর্শিনী হাকিমের। মন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের কন্যা প্রিয়দর্শিনী হাকিম দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়ভাবে মমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের থেকে লড়াই করে চলেছেন কলকাতা থেকে শুরু করে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গিয়ে। প্রিয়দর্শনীকে মমতা ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত স্নেহ করেন। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে প্রিয়দর্শিনীকে অপেক্ষাকৃত কঠিন কোন বিধানসভা আসনে প্রার্থী করার কথা ভাবছে তৃণমূল।

বিজেপির টিকিটে জিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার পরেও নরেন্দ্র মোদির বিরোধিতা করে মমতার হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন বাবুল সুপ্রিয়। তা ঠিক আগেই একুশের বিধানসভা নির্বাচনের টালিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে অরূপ বিশ্বাসের কাছে হেরে গেলেও অরূপের সঙ্গে বাবুলের যথেষ্ট সুসম্পর্ক। রাজ্যের মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও মমতা বাবুলকে এবারে পাঠিয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ করে। তৃণমূলের অন্দরে কানাঘুষো রয়েছে বাবুলের স্ত্রী-কে হয়তো প্রার্থী তালিকায় রাখতে পারেন অভিষেক।

গত কয়েক মাস ধরেই বাংলা বাঁচাও গণ মঞ্চের ব্যানারে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য। সুমনের বাবা প্রিয়রঞ্জন দাস মুন্সির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার জন্য একদিকে যেমন তার পরিবারের কংগ্রেসী রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় অন্যদিকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলায় বাম রাজনীতির একটা বড় অংশের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল সুমনের। এবারে ধর্মতলার ধরনামঞ্চেও মমতার কাছাকাছি দেখা গিয়েছে সুমনকে। তবে তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে সুমন ভট্টাচার্যের স্ত্রী তনভীর নাসরিনকে দক্ষিণবঙ্গের একটি জেলার প্রার্থী করা হতে পারে।

অন্যদিকে উত্তর কলকাতার আরেক পুরনো তৃণমূল নেতা অতীন ঘোষের মেয়ের নাম প্রার্থী তালিকায় আসতে পারে বলেও চলছে নানা জল্পনা।

কয়েকদিন আগেই সিপিএম থেকে অভিষেকের হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন দাপুটে নেতা প্রতীক উর রহমান। নিজে সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রার্থী হতে চান না বলে দাবি করলেও অভিষেক চাইছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার অপেক্ষাকৃত বাম মনোভাবাপন্ন একটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করতে।
এছাড়াও এবারে বিধানসভা নির্বাচনে মমতা প্রার্থী করতে চলেছেন রাজ্যসভার সদ্য প্রাক্তন সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।